২৬ অক্টোবর ২০২৬ , ১১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

কার হাতে ঠাকুরগাঁও-১’র চাবিকাঠি?

বিশেষ প্রতিনিধি
আপলোড সময় : ২৬-১০-২০২৬
কার হাতে ঠাকুরগাঁও-১’র চাবিকাঠি? ছবিঃ সংগৃহীত

ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে জমে ওঠা ভোটের মাঠে এখন সবচেয়ে বড় আলোচনা প্রায় দেড় লাখ হিন্দু ভোটার বা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক অবস্থান। সদর, রুহিয়া ও ভূল্লী এলাকা নিয়ে গঠিত এই আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ১৬ হাজার ১৩৮ জন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই ভোটব্যাংকের সমর্থন ধানের শীষের প্রার্থীর বাক্সে গেলেও, বর্তমান উপনির্বাচনে তাদের ভূমিকা ও মানসিকতা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ঠাকুরগাঁও সদর, রুহিয়া ও ভূল্লী এলাকা নিয়ে গঠিত এই সংসদীয় আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ১৬ হাজার ১৩৮ জন। এর মধ্যে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভোটার রয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজারের অধিক, যা মোট ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এবং এই নির্বাচনের মূল ‘কিংমেকার’ বা জয়-পরাজয়ের নিয়ন্ত্রক। স্থানীয় জনমিতি ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, হিন্দু ভোটার বাদে বাকি প্রায় ৩ লাখ ৭৬ হাজার ভোটারের সিংহভাগই মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত। তবে নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক তথ্যে সাধারণত ধর্মভিত্তিক বা বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আলাদা কোনো স্বতন্ত্র পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয় না; যদিও স্থানীয় এলাকায় কিছু অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে এবং এই আসনে তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজড়া ভোটার রয়েছে মাত্র ৪ জন।

মাঠপর্যায়ের নানা আলোচনা ও সাধারণ মানুষের বক্তব্য বিশ্লেষণে এই ভোটারদের মনের গহিনে থাকা মনোভাবটি বেশ স্পষ্ট। গত নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করার পর স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশের মূল্যায়ন ছিল এমন—“আমরা যেন বিএনপির মেহমান হিসেবে বেড়াতে এসেছি। তারা যদি আমাদের সঠিকভাবে আপ্যায়ন ও নিরাপত্তা দিয়ে আগলে রাখে, তবে আমরা তাদের সাথেই তাদের ঘরে থেকে যাবো; আর যদি আমাদের ঠিকমতো মূল্যায়ন বা আপ্যায়ন না করে, তবে আমরা আবারও আমাদের আগের ঘরে ফিরে যেতে বাধ্য হব।” সংখ্যালঘু এই ভোটব্যাংকের এমন শর্তযুক্ত ও সতর্ক অবস্থানই উপনির্বাচনের পুরো সমীকরণকে পাল্টে দিয়েছে।

এই ভোটারদের মন জয় করতে মাঠে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে প্রধান দলগুলো। বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমিন (ধানের শীষ) দিনরাত গণসংযোগ চালিয়ে আশ্বস্ত করছেন যে, যেকোনো পরিস্থিতিতে বিএনপি সবসময় তাদের পাশে রয়েছে এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। বিএনপি প্রার্থীর দাবি, তারা এখন আর আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক নেই এবং ঠাকুরগাঁওয়ের হিন্দু সম্প্রদায় ইতোমধ্যে বিএনপির ওপর আস্থা রেখে তার ভালো প্রতিফলন পেয়েছে। অন্যদিকে, পুরোনো এই ভোটব্যাংকে ফাটল ধরাতে ভিন্ন কৌশল নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন (দাঁড়িপাল্লা) বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বমুক্ত ঠাকুরগাঁও গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন। তবে নির্বাচনী ময়দান উত্তপ্ত করে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ারসহ দলটির শীর্ষ নেতারা ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং বিভিন্ন সরকারি সহায়তা বিতরণে বিএনপির বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও দলীয়করণের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। জামায়াত প্রার্থীর দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে তিনি হিন্দু সমাজের সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করেছেন এবং এবার ভোটাররা তাকেই বেছে নেবেন। রাজনৈতিক নেতাদের নানা প্রতিশ্রুতির ভিড়ে সাধারণ ভোটাররা এবার অনেক বেশি সচেতন। ঢোলারহাট এলাকার বাসিন্দা কংগ্রেস সরকার বলেন, আমাদের মূল চাওয়া—শান্তিতে বসবাস, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং জানমালের নিরাপত্তা। যে প্রার্থী আমাদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের আস্থা দিতে পারবেন, আমরা তাকেই বেছে নেব।

পৌর শহরের বাসিন্দা ডা. শুকদেব চন্দ্র দাস মনে করেন, বিগত নির্বাচনে হিন্দু সম্প্রদায় এক বাক্সে ভোট দিলেও এবার তা অন্ধভাবে হবে না। তারা এখন প্রার্থীর যোগ্যতা এবং তাদের ‘মেহমানদারি’ বা নিরাপত্তার বাস্তব প্রতিফলন দেখেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী ২৯ অক্টোবরের উপনির্বাচনে বিএনপি তাদের আগের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারবে কি না, কিংবা জামায়াত নতুন কোনো চমক সৃষ্টি করতে পারবে—তার পুরোটাই নির্ভর করছে এই ‘মেহমান’ ভোটারদের চূড়ান্ত সন্তুষ্টি ও মনস্তত্ত্বের ওপর। যে প্রার্থী এই সম্প্রদায়ের মনে পুরোপুরি আস্থার জায়গা তৈরি করতে পারবেন এবং পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক প্রচারের ভিড়ে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করতে পারবেন, তিনিই শেষ পর্যন্ত বিজয়ের হাসি হাসবেন।



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ